এই লক্ষণগুলো শারীরিক নয়, বরং মানসিক চাপের ফলাফল! মিলিয়ে নিন...
বলা হয়ে থাকে মনের সাথে শরীরের সরাসরি সংযোগ রয়েছে। মন ভালো থাকলে, নিজ থেকেই শরীর সুস্থ থাকে। কিন্তু কোন কারণে মনে একটুও বিষাদের ছায়া পড়লে, সেটার প্রভাব পড়ে থাকে শরীরের উপরেও। বিস্ময়কর এই ব্যাপারটি কি আসলেও সত্যি? ‘অ্যামেরিকান সাইকলোজক্যাল এসোসিয়েশন তাদের সার্ভে থেকে জানায়, এক-তৃতীয়াংশ মানুষ বলছেন মানসিক চাপ বা ধকল তাদেরকে মানসিক ও শারীরিকভাবে অসুস্থ করে তোলে। নিম্নে উল্লেখিত কোন লক্ষণ যদি আপনার সাথেও মিলে যায় তবে সেটা প্রকাশ করে, আপনি মানসিক চাপের শিকার।
শরীরে র্যাশে দেখা দেওয়া
হুট করেই যদি শরীরে চুলকানিযুক্ত লাল রঙের র্যাশে দেখা দেয় তবে সেটার কারণ অ্যালার্জি নাও হতে পারে। হয়তো অতিরিক্ত মানসিক চাপের ফলেই এমনটা দেখা দিচ্ছে। শরীর অনেক বেশী মানসিক চাপের সম্মুখীন হলে ‘হিস্টামিন’ নামক এক প্রকারের কেমিক্যাল নিঃসরণ করতে শুরু করে। এই কেমিক্যাল শরীরের বিভিন্ন ধরণের রোগ প্রতিরোধ করে থাকে। যদি এর মাঝে মানসিক চাপ কমে না যায় তবে সেটা থেকেই এমন অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া শরীরে দেখা দিতে শুরু করে। এছাড়াও, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দূর্বল হলেও ঠাণ্ডা লাগা সহ বিভিন্ন ধরণের সমস্যা দেখা দেওয়া শুরু হয়।
এমতাবস্থায় কী করতে হবে?
শরীরের যে অংশে এমন লাল রঙের র্যাশে দেখা দিবে সেখানে ভেজা ও ঠাণ্ডা তোয়ালে দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। চেষ্টা করতে হবে স্ট্রেস কম করার।
ওজনে তারতম্য দেখা দেওয়া
মানসিক চাপ’কর্টিসল’ নামক হরমোন নিঃসরণের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। যা শরীরের রক্তে চিনির মাত্রা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দূর্বল করে দেয়। একইসাথে কমে যায় মেটাবলিজমের হার। যার ফলে ওজন হয় বেড়ে যায় অথবা কমে যায়, জানান নিউ ইয়র্কের ইচাহন স্কুল অফ মেডিসিন-এর ক্লিনিক্যাল ইন্ট্রাকটর অফমেডিসিন এবং ফিজিশিয়ান লেভিন. এমডি। এছাড়াও, মানসিক চাপের মুখে মানুষ অনেক অস্বাস্থ্যকর অভ্যাসে জড়িয়ে পড়ে। যেমন: অতিরিক্ত খাওয়া-দাওয়া করা, যা থেকেও ওজন বেড়ে যাবার মতো ঘটনা ঘটে থাকে।
এমতাবস্থায় কী করতে হবে?
মানসিক চাপের সময়ে বেশি করে বাদাম খেতে হবে। বাদাম খাওয়ার ফলে ক্ষুধা নিবারন হয়। এছাড়া বাদামে থাকে প্রচুর পরিমাণে আঁশ। যা স্বাস্থ্যকর।
নিয়মিত মাথাব্যথা দেখা দিতে থাকে
যদি ইতিপূর্বে আপনার মাথাব্যথার সমস্যা না থাকে এবং হুট করেই মাথায় প্রবল ব্যথা দেখা দেওয়া শুরু হয়, তবে বুঝতে হবে মানসিক চাপের ফলেই এমনটা দেখা দিচ্ছে। মানসিক চাপের ফলে শরীরে কিছু কেমিক্যাল নিঃসরণ হওয়া শুরু হয়। যা মস্তিষ্কের নার্ভ ও রক্ত নালীকার মাঝে পরিবর্তন নিয়ে আসে। এর ফলেই দেখা দিয়ে থাকে মাথাব্যথা। এছাড়াও, মানসিক চাপের ফলে পেশীর উপরেও চাপ সৃষ্টি হয়। যে কারণে বারবার মাথাব্যথা দেখা দিতে থাকে।
এমতাবস্থায় কী করতে হবে?
মাথাব্যথার সমস্যা দেখ দিলে কয়েক ফোঁটা ল্যাভেন্ডার অয়েল অথবা টি ট্রি অয়েল কপালে ম্যাসাজ করতে পারেন। তবে স্ট্রেস মুক্ত জীবন যাপন করাই একমাত্র সমাধান।
পেটের সমস্যা দেখা দেওয়া
মানসিক চাপের ফলে বিভিন্ন ধরণের সমস্যা দেখা দেওয়ার মাঝে পেটের সমস্যাও দেখা দেওয়া শুরু করতে পারে। এর ফলে শরীর প্রয়োজনের তুলনায় বেশী পরিমাণে পরিপাক (পাচক) অ্যাসিড নিঃসরণ করা শুরু করে। যা থেকে বুক জ্বালাপোড়া দেখা দেয়। অথবা, খাদ্য ধীরে পরিপাক করার সমস্যা দেখা দিতে পারে। যার ফলে পেট ফাঁপাভাব এবং ব্যথা তৈরি হয়। এছাড়াও কোষ্ঠ্যকাঠিণ্য অথবা ডায়রিয়ার মতো সমস্যাও শুরু হতে পারে। মায়ো ক্লিনিকের ইন্টার্নাল মেডিসিনাল ফিজিশিয়ান ডেবরাহ রোডেস জানান উক্ত সমস্যা সমূহের কথা।
এমতাবস্থায় কী করতে হবে?
পেটের সমস্যা দেখা দেওয়া শুরু করলে নিয়মিতভাবে আদা-চা খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। আদার রস পেটের সমস্যার ক্ষেত্রে উপকারী।
সবসময় ঠাণ্ডার সমস্যা ভোগা
অতিরিক্ত মানসিক চাপ শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে ফেলে। যার ফলে ছোটখাটো শারীরিক সমস্যা প্রায়শ দেখা দিতে থাকে। যার মাঝে প্রধান সমস্যা হলো ঠাণ্ডার সমস্যা দেখা দেওয়া। কার্নেগী মেলোন ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা কিছু ভলান্টিয়ারদের মাঝে ঠাণ্ডার ভাইরাস দ্বারা ইচ্ছাকৃতভাবে আক্রান্ত করেন। এর মাঝে যারা মানসিক চাপের মুখে ছিলেন তারা অন্যান্যদের তুলনায় দ্বিগুণ অসুস্থ হয়ে পড়েন।
এমতাবস্থায় কী করতে হবে?
এক গবেষণা থেকে দেখা গেছে, ঠাণ্ডার সমস্যার ক্ষেত্রে জিঙ্ক গ্রহণে চব্বিশ ঘণ্টার মাঝে সমস্যা কমে যায়। যে কারণে ঠাণ্ডার প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে জিঙ্কযুক্ত খাদ্য গ্রহণের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে হবে।
ব্রণের সমস্যা দেখা দেওয়া
ব্রণের সমস্যা বিভিন্ন কারণে দেখা দিতে পারে। তবে বারবার ব্রণের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার অন্যতম কারণ হলো মানসিক ধকল। যার অন্যতম কারণ হলো হরমোনের তারতম্য দেখা দেওয়া। মানসিক চাপের মুখে শরীর থেকে বেশি পরিমাণে হরমোন নিঃসৃত হয়ে থাকে। যার ফলে শরীর অতিরিক্ত তেল তৈরি করে থাকে। এর ফলে ত্বকের রোমগ্রন্থিতে তেল ও ময়লা জমে ব্রণের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়া শুরু করে।
এমতাবস্থায় কী করতে হবে?
ব্রণের এমন ঘনঘন সমস্যা দেখা দিলে গ্রিন টি দিয়ে মুখ ধুয়ে ফেলতে হবে। গ্রিন টিতে থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ত্বকে ব্রণ তৈরিতে বাঁধা প্রদান করে থাকে।
অতিরিক্ত চুল পড়া শুরু করা
সাধারণভাবে প্রতিদিন একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের ৫০-১০০ টি চুল পড়ে থাকে। যেটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু মানসিক চাপের মুখের এর মাত্রা বেড়ে যায় অস্বাভবিকভাবে। মানসিক চাপের জন্যে একটি বড় অংশ চুল দ্রুত ‘রেস্টিং পিরিওড’ পর্যায়ে চলে আসে। যেটা আরও এক মাস পরে যাওয়ার কথা স্বাভাবিকভাবে। এছাড়াও, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার ফলেও চুল পড়ার হার বৃদ্ধি পেয়ে থাকে।
এমতাবস্থায় কী করতে হবে?
এমন অবস্থায় নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করতে হবে এবং পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। মানসিক চাপ কমে গেলে চুল পড়ার হার নিজ থেকেই স্বাভাবিক হয়ে আসে।
সূত্র: Readers digest

No comments